দাঁত আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো অপরিহার্য একটা অংশ। দাঁতের গুরুত্ব আমরা তখনই বুঝতে পারি যখন দাঁত না থাকে। তাই সবসময় আমরা চেষ্টা করি দাঁত সংরক্ষন করার জন্য,কিন্তু তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের দাঁত তোলার প্রয়োজন হয়।
দাঁত তুলে ফেলার পরামর্শ এখন খুব কম ক্ষেত্রে দেয়া হয়।
আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ডেন্টাল চিকিৎসকরা এতটাই নিজেদের সময়োপযোগী করেছে যে রোগী চাইলে ক্ষতিগ্রস্থ দাঁত সংরক্ষণ সম্ভব হয়। কারণ, বিভিন্ন রোগে দ্রুত সময়মতো চিকিৎসা নিলে দাঁত ফেলে দেওয়ার আর দরকার পড়ে না। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই রোগের মেয়াদ যত দীর্ঘায়িত হবে অথবা অনুমোদনহীন চিকিৎসকের কাছে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে তত তার সুচিকিৎসা পদ্ধতি জটিল হবে। তাই রোগের শুরুতেই অনুমোদিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।
বিষয়গুলো কমবেশি জানার পরও প্রতিনিয়ত আমাদের দাঁত ফেলতে হচ্ছে কোনো উপায় না থাকার কারণে।দাঁত কখন তুললে ভালো হবে বা কেন দাঁত তুলবেন। যেসব কারণে দাঁত ফেলতে হয়-
আক্কেল দাঁত
অপেক্ষাকৃত দেরিতে ওঠে বলে মাড়ির সর্বশেষ দাঁতটিকে উইসডম টুথ বা আক্কেল দাঁত বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাঁতটি বাঁকা হয়ে ওঠার কারণে স্থানটিতে প্রদাহ বা দাঁতটিতে বড় গর্ত হয়ে যায়। অবস্থানগত কারণ ও কার্যকারিতা কম বলে বেশিরভাগ সময় দাঁতটিকে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বিশেষ পদ্ধতিতে এ দাঁত তোলার প্রয়োজন পড়ে।
দাঁতের ধারককলা ক্ষতিগ্রস্ত
প্রতিটি দাঁত চোয়ালের হাড় ও মাড়ির মাধ্যমে শক্তভাবে নিজ স্থানে আটকে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি মাড়ির রোগ বা দাঁতের সংক্রমণ, দুর্ঘটনা, ডেন্টাল ফ্লসের পরিবর্তে টুথপিক বা ধাতব কাঠির অতিরিক্ত ব্যবহার, ক্যালসিয়ামের অভাব ও হাড় ক্ষয়, অটোইমিউন রোগ বা অন্য কোনো কারণে দাঁতের ভিত দুর্বল হয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় নড়ে গেলে দাঁত ফেলে দিতে হয়।
রুট ক্যানেল চিকিৎসা শেষ না করা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রুট ক্যানেল চিকিৎসার শুরুতেই দাঁতের ব্যথা কমে যায়। অনেকেই ব্যথা কমে গেলে বা রুট ক্যানেল চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো পরবর্তী কাজ বা কৃত্রিম ক্রাউন বা ক্যাপ করে না। পুরো চিকিৎসা শেষ না করার জন্য দাঁতটি এমনভাবে ভেঙে যেতে পারে যখন আর দাঁতটিকে সংরক্ষণ করা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে দাঁতের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বা মুখের যত্নে চরম অবহেলা থাকলেও দাঁত ফেলে দিতে হতে পারে।
অবহেলা
দীর্ঘদিন দাঁতের ব্যথা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না নেওয়া অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে দাঁত ক্রমান্বয়ে ভেঙে যেতে পারে এবং বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দাঁত সংরক্ষণ কষ্টসাধ্য।
অন্যান্য
দাঁতের কাছাকাছি টিউমার, ক্যানসার বা চোয়ালের হাড় ভেঙে গেলে অথবা দুর্ঘটনায় বা ক্যারিজ থেকে দাঁতের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হলে দাঁত ফেলতে হবে।
দাঁত তোলার আগে করণীয়
চিকিৎসক জিজ্ঞেস না করলেও তাকে রোগীর অন্যান্য কোনো শারীরিক জানা রোগ সম্পর্কে বলতে হবে, যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, কোথাও কেটে গেলে দেরিতে রক্ত বন্ধ হওয়া, লিভার বা কিডনিতে রোগ, এলার্জি, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা, গর্ভাবস্থাসহ কোনো সার্জারি হয়েছিল কিনা, এমনকি অন্য কোনো কারণে কোনো ওষুধ খাচ্ছে কিনা তাও বলতে হবে যেমন এসপিরিন, স্টেরয়েড ইত্যাদি। বিষয়গুলো স্পষ্ট না হলে দাঁত তোলা থেকে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। অতিসাধারণ ডায়াবেটিক, উচ্চরক্তচাপ বা রক্তের কোনো রোগ ডেন্টাল চিকিৎসা থেকে শনাক্ত হয়। তাই দাঁত তোলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সন্দেহ থাকলে কিছু ল্যাব টেস্ট করার বিষয় থাকলে সেটা মানতে হবে, মনে রাখতে হবে দাঁত তোলাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
দাঁত তোলার পর করণীয়
* ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধের নাম, মেয়াদের সময়কাল, সময়ের ব্যবধান ও যতদিন বলা হবে সেগুলো সঠিকভাবে নিতে হবে, ইচ্ছামতো ওষুধ সেবনে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হতে পারে।
* গজ বা তুলা এক ঘণ্টা বা নির্দেশমতো কামড় দিয়ে রাখতে হবে।
* প্রথম ৬ ঘণ্টা গরম ও শক্ত খাবার গ্রহণ না করা ভালো ও কুলি না করতে বলা হয়।
* ২৪ ঘণ্টা পর থেকে উষ্ণ পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করা যেতে পারে।
* সার্জিকাল দাঁত তোলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ঠাণ্ডা প্যাক বা বরফ থেরাপির প্রয়োজন পড়তে পারে ও সেলাই হলে ৭ দিন পর সেটা কাটিয়ে নিতে হবে।
* যে কোনো প্রয়োজনে যেমন অধিক রক্তপাত, ফুলে যাওয়া, অসহনীয় ব্যথা, শরীরের কোথাও কোনো চুলকানি ধরনের র্যাশ বা যে কোনো অস্বাভাবিকতায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, দাঁত তোলা কিন্তু সার্জারির অন্তর্ভুক্ত। অনুমোদনহীন চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে অনুমোদিত বিডিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক বেছে নিতে হবে, তা না হলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ